"তোমাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই ভাতের সাথে মিশানো হয়েছে নীল রঙের বিষ"--ভাতের থালা সামনে নিয়ে মৃত্তিকার কানে বাজতেই থাকে এই কথা। রুমের ফ্যানটা তার কাছে এক ডানাওয়ালা দানব যেটা ছিঁড়ে পড়বে যেকোনো সময়।পথে চলার সময় কিংবা বাসে মনে হয় কেউ যেনো তার জীবনযাত্রা কে রেকর্ড করে চলছে অনবরত। এসব অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনার মধ্যও মৃত্তিকার চোখে মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, অতিরিক্ত টেনশন করলেও ওর কপালে এক ফোঁটা ঘাম বা চোখে কোণে ভয়ের ঝিলিক থাকেনা।পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকা মৃত্তিকার ভেতরে যখ মহাপ্রলয় চলছে, বাইরে তখন এক অদ্ভুত হিমশীতল নীরবতা।

হাসি খুশি থাকা মৃত্তিকার পৃথিবী এখন দুইভাগে বিভক্ত। যেখানের এক ভাগ তার চিরচেনা রক্তমাংসের মানুষ আর অন্যভাগ! অন্যভাগ দেখা যায়না, কানে আসে কিছু কন্ঠস্বর, চোখে ভাসে অবাস্তব কিছু দৃশ্য!
মস্তিষ্ক থেকে আসা এই কন্ঠস্বর মৃত্তিকার কাছে একদম বাস্তব।মাঝরাতে হঠাৎ চিৎকারে কিংবা কাজের মধ্য আৎকে উঠলে আপনজনরা কাছে আসে, সান্ত্বনা দেন। কিন্তু মৃত্তিকা ততক্ষণে পাথরের মতো স্থির। তার চোখে কোনো জল নেই, মুখে কোনো ভয়ের ছাপ নেই। একেই বলে 'ফ্ল্যাট অ্যাফেক্ট' (Flat Affect)-ভেতরে এক প্রচণ্ড ঝড় চললেও বাইরে সে কোনো আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। তার আপনজনেরা ভাবেন মৃত্তিকা বদলে গেছে, পাষাণ হয়ে গেছে; কিন্তু সে আসলে তার অসুস্থ মস্তিষ্কের কাছে বন্দী।

মাঝেমধ্যে মৃত্তিকা কিছু বলতে শুরু করে, কিন্তু তার এ বলার সাথে কাজের কোনো মিল থাকে না। সে হয়তো বলছে বা শুনছে খুব খুশির কোনো সংবাদ, কিন্তু তার অভিব্যক্তি তখন গম্ভীর। কিংবা খুব সাধারণ একটি কাজ করতে গিয়ে সে এমন সব অসংলগ্ন আচরণ করে, যা দেখে চারপাশের মানুষ হাসাহাসি করে আর "পাগল" তকমা টা সহজেই পড়ে যায়। এই 'অসংলগ্ন আচরণ ও কথাবার্তা' সিজোফ্রেনিয়ার একটি অন্যতম লক্ষণ, যা তাকে সাধারণ জীবন থেকে যোজন যোজন দূরে সরিয়ে দেয়।
অস্থিরতার সাথে চারপাশে তাকানো, বিড়বিড় করা, এক দৃষ্টিতে কোথাও তাকিয়ে থাকা--এসব বাইরে থেকে দেখে কেউ হাসে,কেউ ভয় পায়। বাসার মানুষগুলোও এক সময় এড়িয়ে চলে। মৃত্তিকার মাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে "মেয়ে টা কি পাগল হয়ে গেলো?!" ইচ্ছা করে করছে ভেবে অনেকে হাসি তামাশা করতে থাকে। কিন্তু মৃত্তিকা প্রতিনিয়ত অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়াই করছে যেখানে সে একা। আমাদের সবার আচরণও তাকে ভাবায় তার শত্রুটা আসলে কে? মস্তিষ্কের মধ্য চলা দোটানা চিন্তা ভাবনা নাকি নিজের সমাজের আপন মানুষ গুলো?
*সিজোফ্রেনিয়া কোনো পাগলামি বা অভিশাপ নয়। এটি নিউরোলজিকাল ডিসঅর্ডার যেখানে আক্রান্ত ব্যাক্তি বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।জিনগত বা মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতার কারণে সৃষ্ট একটি জটিল মানসিক রোগ।

**মৃত্তিকার মতো সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত ব্যাক্তিরা প্রতিদিন যা অনুভব করেন::

অডিটরি হ্যালুসিনেশন (শব্দ শোনা): তারা এমন সব আওয়াজ বা কণ্ঠস্বর শোনেন যা আসলে নেই। এই শব্দগুলো অনেক সময় তাদের আদেশ দেয় বা ভয় দেখায়।

আবেগহীনতা: অনেক সময় তীব্র কষ্ট বা আনন্দের মুহূর্তেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন না। এর মানে এই নয় যে তারা অনুভব করছেন না, বরং তাদের মস্তিষ্ক সেই আবেগ প্রকাশ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

অসংলগ্ন কথাবার্তা ও আচরণ: তারা যা বলছেন তার সাথে অনেক সময় বাস্তবের কোনো সংযোগ থাকে না। কাজের ধারায় কোনো শৃঙ্খলা থাকে না, যা তাদের সামাজিক জীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

***তাদের কে "পাগল" ভেবে কিংবা আলাদা করে না দিয়ে তাদের কে বোঝার চেষ্টা অত্যন্ত জরুরী।

বিচ্ছিন্নতা নয়, আলিঙ্গন: সিজোফ্রেনিয়া রোগীরা সাধারণত বিপজ্জনক হন না, বরং তারা নিজেরাই প্রচণ্ড ভয়ের মধ্যে থাকেন। তাদের সমাজ থেকে আলাদা করে দেওয়া মানে তাদের আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া।

অদৃশ্য ক্ষত: আমরা ভাঙা হাড় দেখতে পাই, কিন্তু ভাঙা মন বা অসুস্থ মস্তিষ্ক দেখতে পাই না। তাদের প্রতি কটু কথা বা বিদ্রূপ তাদের স্নায়বিক চাপ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

পরিবার ও সহনশীলতা : একজন আক্রান্ত মানুষের কাছে তার পরিবারই শেষ আশ্রয়।তাদের পাগল না বলে, একজন রোগী হিসেবে গ্রহণ করুন।
সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা আপনার দয়া নয়, বরং আপনার স্বাভাবিক ব্যবহার এবং সহনশীলতা চান।

চিকিৎসা: এটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক ওষুধ এবং থেরাপির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ওঝা বা ঝাড়ফুঁক নয়, তাদের প্রয়োজন একজন অভিজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্ট।
সমাজ থেকে তাদের আলাদা করে না দিয়ে মূলধারায় রাখার চেষ্টা করুন। একা করে দিলে রোগটি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।